
অপরাধ বিচিত্রা: রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এবং তার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পিএলসি ICB AMCL)’র বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন,
ধর্মীয় অবমাননা এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও
প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এখানে হাজার হাজার গ্রাহক ‘হালাল’মনে করে হারাম লেনদেনে যুক্ত
হয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, আইসিবি’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা বিগত সরকারের উচ্চ মহলকে খুশি
করতে এদেশের সাধারণ ইসলামপ্রিয় গ্রাহকদের হারাম লেনদেনে যুক্ত করে এই চরম ক্ষতিসাধন করেছে।
আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট মূলত সাধারণ মানুষের জমানো টাকা দিয়ে বিভিন্ন ইসলামী বা শরীয়াহ ভিত্তিক
ফান্ড (যেমন সুকুক বা হালাল বন্ড) পরিচালনা করে। হাজার হাজার মানুষ সুদের অভিশাপ থেকে বাঁচতে এবং
‘হালাল’ উপায়ে মুনাফা অর্জনের আশায় সরল বিশ্বাসে এসব ফান্ডে বিনিয়োগ করেন এবং সেখান থেকে লভ্যাংশ
পেয়ে জীবন জীবিকা চালিয়ে থাকেন।
বিগত সরকারের আমলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এই আর্থিক থাতেও অভিযোগ ছিল- আইসিবি ও তার
তিনটি সাব-সিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের সকল নীতি-নির্ধারনী ও বিনিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও নিয়োগসহ প্রায়
সকল বিষয়ে ভারতের ‘ইশকন’ (ISKCON) ও ‘র’ (RAW)- এর প্রচ্ছন্ন হাত রয়েছে। আইসিবি কোথায় বিনিয়োগ
করবে, কোথা থেকে বিনিয়োগ নেয়া যাবে, পদোন্নতি, পদায়ন ও নিয়োগ – সবই নির্ধারিত হতো এই উচ্চ মহলকে
প্রাধান্য দিয়ে। আরও অভিযোগ, সেই ভারত-সমর্থিত সিন্ডিকেট এখনো দাপটের সাথে বহাল আছে।
ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একমাত্র ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
মূল কাজ হলো সরকারি অর্থে পুঁজিবাজারে সরাসরি বিনিয়োগ, শেয়ার ও ডিবেঞ্চার ক্রয়-বিক্রয়, মিউচুয়াল ফান্ড
ব্যবস্থাপনা, আন্ডাররাইটিং, লিজ অর্থায়ন এবং বিভিন্ন লাভজনক ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ও ঋণ
প্রদান। সংক্ষেপে, আইসিবি হলো পুঁজিবাজারে সরকারের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও ব্যবস্থাপক।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, উক্ত প্রতিষ্ঠানটি বিগত সরকারের আমলে শুরু হওয়া কোনো
সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা ছাড়াই অবৈধভাবে ‘শরীয়াহ্ অ্যাডভাইজরি বোর্ড’
নামে ফতোয়া বোর্ডের মাধ্যমে ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন করে অমুসলিমদের এই বোর্ডে সরাসরি অর্ন্তভুক্তির মাধ্যমে
মনমতো বিনিয়োগ, ফান্ড গঠন ও লভ্যাংশ প্রদান করে চলেছে। যা শরিয়ত মতে- সম্পূর্ণ হারাম এবং ইসলামী
শরীয়াহ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। অভিযোগ আছে, এটি বিগত সরকারের উচ্চমহলকে সন্তুষ্ট করার জন্য
অমুসলিম নিয়োগ করা হয়েছিল। বর্তমানেও এই মুসলিম ফতোয়া বোর্ডের সরাসরি সদস্য হিন্দু ধর্মাবলম্বী
ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ।
গত ২৭/০৫/২০২৫ তারিখে আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের কাছে তাদের ‘শরীয়াহ্ অ্যাডভাইজরি বোর্ড’-এর
বৈধতা ও নীতিমালা সম্পর্কে তথ্য অধিকার আইনে জানতে চাওয়া হলে গ্রাহকদের সাথে এই ভয়াবহ জালিয়াতির
বিষয়টি ফাঁস হয়। ওইসময় সেখানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন
প্রভাবশালী নেত্রী (বর্তমান মূল আইসিবি’র জিএম) যিনি বিগত বছরগুলোতে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বেড়ানো
একজন কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার। শুরু হয়, তথ্য প্রদানে বিভিন্ন প্রকার টালবাহানা, ভয়ভীতি ও আর্থিক
প্রলোভন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ এই আইনে জবাব প্রদানে বাধ্য হন। উক্ত জবাবে,
‘শরীয়াহ্ অ্যাডভাইজরি বোর্ড নীতিমালা অনুযায়ী কোনো অমুসলিম ব্যক্তি শরীয়াহ বোর্ডের সদস্য হতে পারবেন
নাÑ এমন কোনো শর্ত উপবিধি ২০১৯’ -এ নেই বলে তারা দাবি করে।
সেসময় ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করে আরো জানায় যে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক
জারিকৃত Bangladesh Securities and Exchange Commission (Securities Market ShariÕah Advisory
Council) Rules, 2022 এর Rule-3.(2), 3.(3), 3.(4) এ কোম্পানিসমূহের শারী’য়াহ্ অ্যাডভাইজরি বোর্ড
গঠনের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে যেখানে ফিকহুল মু’আমালত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সদস্যের বাহিরে নির্দিষ্ট ইন্ডাস্ট্রি
অথবা সেক্টর অথবা সিকিউরিটিজ মার্কেট, আইন, ফিন্যান্স, ব্যাংকিং অথবা হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে অভিজ্ঞ
সদস্যের অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া, কোনো অমুসলিম ব্যক্তি যে শারী’য়াহ্ ফতোয়া বোর্ডের সদস্য হতে
পারবেন না এ ধরণের কোনো শর্ত আলোচ্য Securities Market ShariÕah Advisory Council Rules, 2022 এ
উল্লেখ নেই বলে বক্তব্য প্রদান করা হয়। সেখানে অমুসলিম সদস্যের সরাসরি নিয়োগের ব্যাপারে কোনো
নিষেধাজ্ঞা নেই। এই ধরণের বক্তব্য ধর্ম অবমাননার শামিল।
জবাবে উল্লেখ করা হয় যে, হাসিনা সরকারের আমলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ড. সুবর্ণ বড়ুয়া এই বোর্ডের সদস্য ছিলেন
এবং বর্তমান আইসিবি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিন্দু ধর্মাবলম্বী এমডি নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ পদাধিকারবলে এই
ফতোয়া বোর্ডে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ এই বোর্ডের বেশ কয়েকজন সদস্য প্রতিবেদককে জানিয়েছেন যে,
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতির বিষয়ে তাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।
আইসিবি’র আরেকটি নীতিমালা সেখানে উল্লেখ রয়েছে যে, শারী’য়াহ্ বোর্ডের যে কোনো সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের
জন্য ৮ জন সদস্যের নূন্যতম এক-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি হলে কোরাম পূর্ণ হবে। সেখানে আইসিবি’ মুল হোল্ডিং
কোম্পানীর এমডি ও চেয়ারম্যান মিলে দু’জন এবং সাবসিডিয়ারি আইসিবি অ্যাসেটের সিইও মাহমুদা আক্তার
মিলে হয় তিনজন। এসবই শুরু হয়েছিল, বাংলাদেশের মসজিদ-মাদ্রাসা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান সহ সর্বত্র
এদেশের ইসলাম ধর্মকে বির্তকিত করে দেবার চেষ্টার অংশ হিসাবে। সেই ধারা অব্যাহত আছে।
আইসিবি জানায়, ইসলামিক ফান্ডসমূহের লেনদেন কার্যক্রমে কোম্পানি শারী’য়াহ বিধি-বিধান ও নীতিমালা তথা
শারী’য়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ড প্রদত্ত দিক নির্দেশনা, সিদ্ধান্ত এবং সুনির্দিষ্ট ফতওয়াসমূহ বাস্তবায়ন করেছে কিনা
সে সম্পর্কে ফিকহুল মু’আমালত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সদস্য ড. মোহাম্মদ হারুন রশিদ বিস্তারিত পর্যালোচনাপূর্বক
লিখিতভাবে মতামত প্রদান করেন। তিনি ২০০৪ সাল থেকেই এই বোর্ডের সাথে যুক্ত আছেন। আমরা জানতে
পেরেছি, ড. মোহাম্মদ হারুন রশিদ বর্তমানে বাংলা একাডেমিতে উপ-পরিচালক পদে কর্মরত আছেন। তার
কাজের প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও সমালোচনা, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক
গবেষণা, বরণীয় ব্যক্তিত্বদের জীবনী ও সৃজনশীল কাজের সংকলন।
আইসিবি অ্যাসেট পিএলসি ২০১৩ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বোর্ডের ৮ জন সদস্যকে সম্মানী বাবদ সর্বমোট
২৮,২৫,১০০.০০ (আঠাশ লক্ষ পঁচিশ হাজার একশত) টাকা প্রদান করেছে।
আমরা আইসিবি’র এই ফতোয়া বোর্ড গঠন ও ফতোয়া প্রদানের বৈধ/অবৈধ বিষয়টি, অর্থ সংগ্রহ ও লাভ-ক্ষতি
প্রদান শরিয়া সম্মত কিনা দিকনির্দেশনা পেতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে আবেদন করা হয়। যার স্মারক নং:
এমআইএইচ/ইফা/শরীয়া-বোর্ড/২০২৫/০২। উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফতোয়া ও
গবেষণা বিভাগের মুফতী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ স্বাক্ষরিত একটি লিখিত ফতোয়া ০২/১১/২০২৫ তারিখে স্পষ্টভাবে
তিনটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দিকনির্দেশনা এ বিষয়ে প্রদান করেন:
১) অমুসলিম সদস্য সরাসরি নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ:
ইসলামী শরীয়াহ এবং ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো অমুসলিম ব্যক্তিকে ইসলামী শরীয়াহ
অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এটি ইসলামের মৌলিক স্তম্ভের সাথে
সাংঘর্ষিক।
২) সদস্যদের সুনির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা:
শরীয়াহ বোর্ডের সদস্য বা মুফতী হওয়ার জন্য নূন্যতম ‘কামিল-ফিকহ’ বা ‘তাখাসসুস ফিল ফাতওয়া’ (মুফতী
ডিগ্রি) থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইসিবির উপবিধিতে এই যোগ্যতার কোনো বালাই নেই, যা শরীয়াহর
অবমাননা। এবং
৩) বর্তমান বোর্ডের অবৈধতা ও পুনর্গঠন:
আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বর্তমান শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের গঠন প্রক্রিয়া সরাসরি ইসলামী
শরীয়াহ পরিপন্থী। তাই এই বোর্ডটি অবিলম্বে বাতিল করে শরীয়াহর সঠিক নিয়ম অনুযায়ী সংশোধন বা পুনর্গঠন
করা একান্ত আবশ্যক।
আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের দাপ্তরিক স্বীকারোক্তি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফতোয়া প্রদানের পর এটি
স্পষ্ট, এই তথাকথিত শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডে ইসলামের নামে ফান্ড সংগ্রহ, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ,
লভ্যাংশ বিতরণসহ যে সকল আদেশ নিষেধ দিয়েছে বা যে সকল ফতোয়া উক্ত সময়গুলোতে জারী করা হয়েছে
সেসকল সম্পূর্ণ অবৈধ ও শরীয়াহ পরিপন্থী। যেখানে অমুসলিম নিয়ে বোর্ডের গঠনই নিয়মবহির্ভূত, সেখানে
তাদের দেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত, ফতোয়া দেয়া এবং দিকনির্দেশনাও আইনগত ও ধর্মীয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া
শরীয়াহ বোর্ডের সদস্য বা মুফতী হওয়ার জন্য নূন্যতম ‘কামিল-ফিকহ’ বা ‘তাখাসসুস ফিল ফাতওয়া’ (মুফতী
ডিগ্রি) থাকা বাধ্যতামূলক। তাদের তৈরি উপবিধিতে এই যোগ্যতার কোনো বালাই নেই, যা শরীয়াহর অবমাননা।
কিন্তু তারা দাবি করছে যে, আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি
বোর্ডের প্রসপেক্টাস বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড একচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত। তারা হাস্যকরভাবে আরও
দাবি করছে যে, কোনো অমুসলিম ব্যক্তি যে শারী’য়াহ্ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য হতে পারবেন না- এ ধরণের
কোনো শর্ত আলোচ্য Securities Market ShariÕah Advisory Council Rules, 2022 এ উল্লেখ নেই। তাই
অমুসলিম ব্যক্তিদের ফতোয়া বোর্ডের সদস্য করা হয়েছে। এটা একটা ধৃষ্টতামূলক চরম বক্তব্য এবং এ বক্তব্য
সরাসরি ধর্মীয় অবমাননার শামিল।
বর্তমানে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং সাধারণ গ্রাহকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথগুলো:-
১) বোর্ডের কার্যক্রমের অবৈধতা ও প্রভাব:
উক্ত অবৈধ শরীয়াহ বোর্ড ফান্ড পরিচালনা সংক্রান্ত যে সকল আদেশ-নিষেধ জারি করেছিল, তার সবই এখন
অকার্যকর বলে গণ্য হওয়ার দাবি রাখে।
২) ফান্ড সংগ্রহ ও বিনিয়োগ:
যেহেতু বোর্ডের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই, তাই ‘হালাল’ বা ‘শরীয়াহ ভিত্তিক’ তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষের
কাছ থেকে ফান্ড সংগ্রহ করা একটি পরিকল্পিত জালিয়াতি ও প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত।
৩) পরিচালনা ও লভ্যাংশ বণ্টন:
এই বোর্ডের অধীনে লভ্যাংশ বণ্টনের যে পদ্ধতি বা হার নির্ধারিত হয়েছে, তা শরীয়াহ সম্মত হওয়ার কোনো
গ্যারান্টি নেই। ফলে গ্রাহকরা অজান্তেই হারাম বা সন্দেহজনক লেনদেনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
৪)ধর্মীয় প্রতারণা:
শরীয়াহ আইন অনুযায়ী যোগ্য মুফতী ছাড়া ফতোয়া প্রদান করা অপরাধ। অমুসলিম সদস্যদের অংশগ্রহণে দেওয়া
সেসব আদেশ যদি হয়ে থাকে তবে গ্রাহকদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে এক ধরনের প্রতারণা।
এখন গ্রাহকদের ন্যায়বিচার পেতে করণীয় এবং প্রতারিত বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ গ্রাহকগণ এই আর্থিক
জালিয়াতির বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার পেতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নিতে পারবেন:-
১. উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির দাবি তোলা:
সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে, একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। এই কমিটি তদন্ত
করে দেখবে, কত টাকা এই অবৈধ বোর্ডের মাধ্যমে ‘হালাল’ সার্টিফিকেট দিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই
জালিয়াতির মাধ্যমে লভ্যাংশ বণ্টনে কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না।
২. লভ্যাংশ ও বিনিয়োগের ‘শরীয়াহ অডিট’ দাবি করা:
বিনিয়োগকারীরা দাবি করতে পারবেন যে, বিগত বছরগুলোতে তাদের লভ্যাংশ এবং ফান্ডের বিনিয়োগগুলো
সঠিক ছিল কি না, তা একজন দক্ষ ও স্বীকৃত ‘শরীয়াহ অডিটর’ বা যোগ্য মুফতীদের একটি প্যানেল দিয়ে অডিট
করানো হোক।
৩. ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ:
বিনিয়োগকারীদের ধর্মীয় ও আর্থিক ক্ষতির দায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির (Penal Code) নির্দিষ্ট
ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে: ৪২০ ধারা: প্রতারণা বা জালিয়াতির জন্য। ৪০৬ ধারা: অপরাধমূলক
বিশ্বাসভঙ্গের জন্য। ৪০৯ ধারা: সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকার কর্তৃক বিশ্বাসভঙ্গের জন্য।
৪. ক্ষতিপূরণ ও রিফান্ড দাবি:
যেহেতু গ্রাহকদের ‘শরীয়াহ ভিত্তিক’ আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করা হয়নি, তাই তারা তাদের মূলধন ফেরত
(Refund) অথবা জালিয়াতির কারণে সৃষ্ট মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করতে
পারেন।
৫. দায়িত্বশীলদের অপসারণ ও শাস্তি নিশ্চিত করা:
জালিয়াতির সাথে সরাসরি জড়িত কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাতে হবে।
কারণ, তারা দায়িত্বে থাকাকালীন তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৬. ধর্ম মন্ত্রণালয় ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ:
যেহেতু বিষয়টি ধর্মীয় অনুভূতির সাথে জড়িত, তাই ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর মাধমে সরাসরি
রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কামনা করা অত্যন্ত কার্যকর পথ হতে পারে। যা ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করবে।
যদিও এ দীর্ঘদিনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি প্রদানের কর্তৃপক্ষ হলো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ
কমিশন। কমিশন নিম্নোক্ত আইনের অধীনে এই অপরাধ তদন্ত ও শাস্তি দিতে পারে: (১) সিকিউরিটিজ অ্যান্ড
এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯, (২) ক্যাপিটাল মার্কেটস স্ট্যাবিলিটি অ্যাক্ট, (৩) ইনভেস্টর প্রোটেকশন আইনের
বিধান, (৪) Fraudulent Financial Practices wel‡q BSEC Regulations এবং (৫) Islamic Investment
Guideline (AAOIFI standard applicable via BSEC)।
যে কারণে বিষয়টি গুরুতর অপরাধ:
ক) অবৈধ বোর্ডের fatwa/decision অনুসরণ করে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ পরিচালনা করা।
খ) শরীয়াহ ভিত্তিক ফান্ড, মুদারাবা, সুকুক ইত্যাদি যেসব গ্রাহক হালাল মনে করে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন সেসব
সিদ্ধান্ত একটি অবৈধ ও শারীয়াহ-বহির্ভূত বোর্ড কর্তৃক প্রদান করা হয়েছে।
ফলে, বিনিয়োগকারীরা হালাল মনে করে হারাম লেনদেনে যুক্ত হয়েছেনÑ যা ইসলামিক শরীয়াহ অনুসারে
মারাত্মক গুনাহ এবং প্রতারণামূলক লভ্যাংশ/ফান্ড ব্যবস্থাপনা ফৌজদারি অপরাধ (দণ্ডবিধি ৪২০, ৪০৬, ৪০৯
ইত্যাদি) হিসেবে গণ্য।
গ) এটি কোম্পানির আর্থিক তথ্য ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন।
ঘ) শরীয়াহ–ভিত্তিক ফান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রেÑ সিকিউরিটিজ আইন, বিএসইসি প্রবিধান, ইসলামিক ফাইন্যান্স
স্ট্যান্ডার্ড, ধর্ম মন্ত্রণালয় নির্দেশনা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ICB AMCL এসব নিয়ম মানেনি।
ঙ) বিনিয়োগকারীদের বৃহৎ ক্ষতি এবং তাদের সাথে আর্থিক প্রতারণা করা হয়েছে। যেসব গ্রাহক ইসলামী
সঞ্চয়/ইনভেস্টমেন্ট স্কিমে অংশ নিয়েছেন তাদের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ভুল Fatwa/সিদ্ধান্ত দেখানো হয়েছে যা
ইসলামীভাবে হারাম আয় করার শামিল।
এবং
চ) এটি Financial Misrepresentation I Criminal Breach of Trust।
উপরোক্ত তথ্য এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লিখিত সিদ্ধান্ত ও আইসিবি AMCL এর নিজের প্রদত্ত তথ্যের
ভিত্তিতে, নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী, (১) আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিঃ-এর অবৈধ শারীয়াহ
অ্যাডভাইজরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন। (২) এসময় কোন ভিত্তিতে তারা “শারীয়াহ
ভিত্তিক হালাল বিনিয়োগ” নামে পণ্য বাজারজাত করেছে তার তদন্ত। (৩) অবৈধ বোর্ডের সিদ্ধান্ত দ্বারা পরিচালিত
ফান্ড/সঞ্চয়/সুকুক/স্কিমগুলোর বৈধতা পুনঃমূল্যায়ন। (৪) বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ও ধর্মীয় ক্ষতির দায়ে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের। (৫) ভবিষ্যতে সকল কোম্পানিকে সরকারি/মান্যপ্রাপ্ত
নীতিমালা ছাড়া ‘শারীয়াহ বোর্ড’ গঠনে নিষেধাজ্ঞা জারি। এবং (৬) ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য
ক্ষতিপূরণ/রিফান্ড ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পিএলসি’র ‘শরীয়াহ্ অ্যাডভাইজরি বোর্ড’-এ ইচ্ছাকৃতভাবে এদেশের ইসলামপ্রিয়
গ্রাহকদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে ছেলে খেলার মতো ‘হালাল’কে হারামে পরিণত করে দিয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই
শরীয়াহ বোর্ডের ফতোয়া অমুসলিম কর্তৃক প্রদান করা হলেও এই বোর্ডের অনেক সম্মানীত সদস্যকে অবহিত পর্যন্ত
করা হয় নাই। যদিও বিগত আমলে সম্মানী বাবদ প্রত্যেক সদস্যের পকেটেই গেছে রাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ টাকা। কিন্তু
চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে এই বিষয়ে কোনো খোঁজ খবরই এই সদস্যগণ রাখেন নাই বা রাখার প্রয়োজনও
হয়তো তারা বোধ করেন নাই।
সাধারণ গ্রাহকদের হালাল বলে হারাম পথে পরিচালিত করা ফৌজদারি অপরাধের সামিল, যার জন্য দৃষ্টান্তমূলক
শাস্তি এবং দোষীদের দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের দাবি ধর্মীয় ও আর্থিক জালিয়াতির দায়ে
এই অবৈধ শরীয়াহ্ বোর্ড গঠনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ধারায় মামলা দায়ের করতে হবে। সরকারি
পর্যায় থেকে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করে বিগত ও বর্তমান অমুসলিম কর্তৃক এই অবৈধ বোর্ডের
মাধ্যমে কত টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং কত লভ্যাংশ প্রদান করা হয়েছে ও কত মানুষ প্রতারিত হয়েছে,
তার শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। এবং বর্তমানে এই সকল জ্ঞানপাপী ও দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত এই প্রতিষ্ঠান থেকে
দ্রুত অপসারণ করা উচিত। কারণ, ইসলামপ্রিয় ভুক্তভোগী গ্রাহকদের জন্য এটা একটা বিপর্যকর পরিস্থিতি।
উপসংহারে বলা যায়, হোল্ডিং কোম্পানী আইসিবি এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের এই জালিয়াতি কেবল একটি ভুল
নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ। গ্রাহকদের ঐক্যবদ্ধ দাবি এবং আইনি লড়াই-ই পারে তাদের কষ্টার্জিত
টাকার নিরাপত্তা এবং পরকালীন ধর্মীয় দায়মুক্তি নিশ্চিত করতে। আদালতের মাধ্যমে বা সরকারের প্রশাসনিক
আদেশের মাধ্যমে এই অবৈধ বোর্ডের সকল আদেশ বাতিল ঘোষণাসহ বর্তমান বোর্ডের পুনর্গঠন করা এখন
সময়ের দাবি।
(আইসিবি বেক্সিমকো গ্রীন-সুকুক আল ইসতিসনা’র শরীয়া বোর্ড সম্পর্কেও এমন ভয়াবহ অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরবর্তী সংখ্যায় এই বিষয়ে এবং এই প্রতিষ্ঠানের আরো কিছু অসৎ চরিত্রের মুখোশ উন্মোচন করা হবে।)
চলবে. . .



