চট্টগ্রাম বিভাগ

মাদক ব্যবসায়ীদের ‘অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড’ ভাঙছেন সিএমপির ওসি সোলাইমান

‎রাশেদুল ইসলাম ঃ ‎চট্টগ্রাম মহানগরীর অন্যতম জনবহুল, স্পর্শকাতর ও অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত বাকলিয়া থানা। একসময় ‘বাকলিয়া মানেই কয়মাস পর পর মার্ডার বা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ’—এমন একটি ধারণা প্রচলিত ছিল এই অঞ্চলে। কিন্তু সেই চেনা বাকলিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এখন দৃশ্যমান ও অভূতপূর্ব ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অপরাধীদের পিছু হটিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি, শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর এই থানায় যোগদানের পর থেকে চলতি মে মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত মাত্র সাড়ে ৫ মাসে মাদক, অস্ত্র ও অপরাধী দমনে তিনি যে সাহসী, জনমুখী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা প্রশংসিত হচ্ছে সর্বমহলে। পুলিশি মূল্যায়নের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাঁর এই অনন্য সাফল্যের খতিয়ান।

‎খুনহীন বাকলিয়া ও রক্তপাতহীন নির্বাচন:

‎​ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান থানায় যোগদানের পর তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্বের একটি হলো বাকলিয়াকে সম্পূর্ণ ‘খুন খারাবী মুক্ত’ রাখা। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত থানা এলাকায় কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া তাঁর দক্ষ ও নিরপেক্ষ পেশাদারিত্বের কারণে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো সম্পন্ন হয়েছে সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন ও শান্তিপূর্ণভাবে, যা বাকলিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

‎​এই প্রসঙ্গে ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, “বাকলিয়ার মতো অপরাধপ্রবণ এলাকায় কোনো খুন ছাড়াই সাড়ে ৫ মাস পার করা এবং নির্বাচনকে রক্তপাতহীন রাখা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, অপরাধ যেন ঘটতেই না পারে—সেই প্রিভেন্টিভ পুলিশিং বা প্রতিরোধমূলক কৌশলে কাজ করেছি। রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগিতায় আমরা এটি করতে পেরেছি।”

‎রমজান ও ঈদুল আযহায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা:

‎​এলাকাবাসীকে কোনো ধরনের অস্বস্তি, চাঁদাবাজি কিংবা চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ছাড়াই একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ রমজান মাস উপহার দিয়েছিল বাকলিয়া থানা পুলিশ। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সদ্য সমাপ্ত ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদেও মাঠপর্যায়ে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান। বাকলিয়া এলাকার পশুর হাটে জাল টাকার কারবার রোধ, হাসিল আদায় ও ব্যবসায়ী-ক্রেতাদের টাকা লেনদেনে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে দেয়নি পুলিশ।

‎​ঈদ পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ওসি বলেন, “রমজান ও ঈদুল ফিতর আমরা যেভাবে নির্বিঘ্নে পার করেছি, আমাদের জন্য তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ঈদুল আযহা। বাকলিয়া ও এর আশেপাশে চট্টগ্রামের বড় বড় পশুর হাট বসে, যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। আমরা আগে থেকেই বিশেষ সেল গঠন করে জাল টাকার চক্র, অজ্ঞানপার্টি-মলমপার্টি এবং জাঁকজমক চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলাম। কোরবানির পশুর চামড়া পাচার বা সিন্ডিকেট রুখতেও আমাদের টিম সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছে।”

‎মাদকের স্বর্গরাজ্যে বড় আঘাত ও মানি লন্ডারিং মামলা:

‎​বাকলিয়া এলাকাকে মাদক মুক্ত করতে যোগদানের পর থেকেই জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান। সাড়ে ৫ মাসের এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনা ও মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে উদ্ধার হয়েছে সর্বমোট ২ লাখ ৯২ হাজার ১৮৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট। এর মধ্যে কেবল মে মাসের প্রথম ১৫ দিনেই রেকর্ড ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৬০ পিস ইয়াবার একটি বিশাল চালান জব্দ করতে সক্ষম হয় তাঁর টিম। এছাড়া এই সময়ে ২ কেজি ৪৪০ গ্রাম গাঁজা এবং ৫০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়েছে। মাদকের এই বিষাক্ত জাল উপড়ে ফেলতে মোট ৬৬টি মামলা দায়েরের মাধ্যমে ৮৪ জন মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিকে আইনের আওতায় এনেছেন তিনি। শুধু গ্রেফতারই নয়, মাদক কারবারিদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা দায়েরের মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপও শুরু করেছেন তিনি।

‎​মাদকবিরোধী এই সাফল্য প্রসঙ্গে ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, “বাকলিয়া থানাকে মাদকমুক্ত করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা শুধু চুনোপুঁটি নয়, মাদকের মূল ডিলার ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছি। এদের অবৈধ আয়ের উৎস এবং সম্পদ চিরতরে ক্রোক করতে আমরা মানি লন্ডারিং মামলার দিকে যাচ্ছি। বাকলিয়ায় কোনো মাদক কারবারির ঠাঁই হবে না।”

‎অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও ২০০ ছিনতাইকারীকে আইনের আওতায় আনা:

‎​এলাকায় সাধারণ মানুষের অবাধ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর অবস্থান নেন ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান। তাঁর নির্দেশনায় পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ১টি এলজি এবং ২টি গুলি কার্তুজসহ ১ জন অস্ত্রধারী অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়, যার বিরুদ্ধে থানায় অস্ত্র আইনে মামলা রুজু হয়েছে। এছাড়া দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে ৩টি মামলায় ১০ জন পেশাদার ছিনতাইকারীকে এবং জুয়া খেলার অপরাধে দ্রুত বিচার আইনের অধীনে ৬টি মামলায় ১৩ জন জুয়াড়িকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের নিয়মিত অভিযানে প্রায় ২০০ জন ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং সদস্যকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আইনের আওতায় এনে বাকলিয়ার সড়কগুলোতে ছিনতাইয়ের উপদ্রব শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছেন তিনি।

‎​অস্ত্র ও ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে ওসি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারীরা সমাজের প্রধান শত্রু। বাকলিয়ার রাস্তায় কোনো ছিনতাইকারী বা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। আমরা প্রায় ২০০ জন ছিনতাইকারীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনেছি। অবৈধ অস্ত্রের উৎস মূলে আঘাত হানতে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি ও রাত্রিকালীন বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।”

‎শিশু ধর্ষণ মামলার আসামিকে রক্ষায় পুলিশের ‘ক্যারিশম্যাটিক’ ভূমিকা:

‎​সম্প্রতি বাকলিয়ায় ৪ বছরের এক শিশু ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দেশে আইনের শাসন নেই—এটি প্রমাণ করার জন্য প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার দুষ্কৃতকারী ও উন্মত্ত জনতা সমবেত হয়ে ধৃত আসামিকে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়। উত্তেজিত জনতার সেই অবৈধ ও আইনবহির্ভূত ইচ্ছাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয় বাকলিয়া থানা পুলিশ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলর সার্বিক সহযোগিতা, দিকনির্দেশনা ও সময়োচিত কৌশলে ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আসামিকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় পুলিশের হেফাজতে নেন এবং প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করেন। পুলিশের এই ‘ক্যারিশম্যাটিক’ ভূমিকা ও দৃঢ় অবস্থান একদিকে যেমন বড় ধরনের রক্তপাত ও দাঙ্গা রুখে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি এলাকার সাধারণ মানুষের মনে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা এনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

‎​এই সংবেদনশীল অভিযান প্রসঙ্গে ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, “সেদিন পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। ৫-৬ হাজার উত্তেজিত জনতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আসামিকে রক্ষা করা ছিল অগ্নিপরীক্ষা। কিন্তু আমাদের মাথায় ছিল, আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেওয়া যাবে না। বিজ্ঞ সিএমপি কমিশনার মহোদয়ের সঠিক গাইডলাইন ও আমাদের তাৎক্ষণিক কৌশলের কারণে আমরা আসামিকে অক্ষত অবস্থায় আদালতে সোপর্দ করতে পেরেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।”

‎পরোয়ানা তামিল ও অপরাধী নিয়ন্ত্রণে রেকর্ড:

‎​পলাতক ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের আইনের মুখোমুখি দাঁড়কাতে বাকলিয়া থানা পুলিশ ছিল অত্যন্ত তৎপর। ওসি মোহাম্মদ সোলাইমানের সুনির্দিষ্ট ছক ও নেতৃত্বে সাড়ে ৫ মাসে বিভিন্ন মেয়াদে সর্বমোট ৩৬৮ জন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধের সুনির্দিষ্ট মামলা মূলে ২৯৯ জন এবং মহানগর অধ্যাদেশসহ প্রতিরোধমূলক আইনের বিভিন্ন ধারায় বিপুল সংখ্যক সন্দেহভাজন ও বিশৃঙ্খলাকারীকে গ্রেফতার করা হয়। এই বিশেষ সময়ে চাঞ্চল্যকর খুন মামলার ৫ জন এবং চুরির মামলায় জড়িত ১৪ জন আসামিকে গ্রেফতার করে পূর্বের অনেক মামলার জট খুলেছে বাকলিয়া থানা পুলিশ।

‎পরোয়ানা তামিল প্রসঙ্গে ওসি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধীদের মনে ভয় ধরানো আমাদের দায়িত্ব, যেন সাধারণ মানুষ রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারে। আমরা ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ জোর দিয়েছি, যার কারণে সাড়ে তিন শতাধিক পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, অপরাধ করে বাকলিয়ায় কেউ পার পাবে না।”

‎জনমুখী ও জনবান্ধব পুলিশিং এবং সাধারণ মানুষের স্বস্তি:

‎​কেবল অপরাধ দমনই নয়, বাকলিয়া থানাকে সাধারণ মানুষের ভরসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ জনমুখী ও জনবান্ধব পুলিশিং করে যাচ্ছেন ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান। থানায় আসা সেবাগ্রহীতারা যাতে কোনো ধরনের দালালি বা হয়রানি ছাড়া দ্রুত আইনি সহায়তা পান, তা তিনি নিজে তদারকি করছেন।

‎​জনবান্ধব পুলিশিং নিয়ে নিজের স্বপ্ন প্রকাশ করে ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, “পুলিশ হবে জনগণের প্রকৃত বন্ধু। আমরা থানাকে দালালমুক্ত করেছি এবং সাধারণ মানুষের জন্য ওসির দরজা সবসময় খোলা রেখেছি। বাকলিয়া থানার প্রতিটি পুলিশ সদস্য যেন জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করে, আমি সেটাই নিশ্চিত করছি। অপরাধমুক্ত, শান্তিময় ও নিরাপদ বাকলিয়া গড়তে আমাদের এই অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।”

‎স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ বাসিন্দারা জানান, ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান যোগদানের পর থেকে পুলিশের টহল জোরদার হয়েছে এবং মাদক-ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে ওসির আপসহীন ভূমিকার কারণে বাকলিয়াবাসী এখন অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করছেন। অপরাধমুক্ত, শান্তিময় ও নিরাপদ বাকলিয়া গড়তে পুলিশের এই ইতিবাচক ও কঠোর অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে, এমনটাই প্রত্যাশা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button