চট্টগ্রামপ্রশাসন

চট্টগ্রামে বিপিডব্লিউএনের কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

মুহাম্মদ জুবাইর: বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন)-এর কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৪-২০২৭ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চট্টগ্রামে দিনব্যাপী এক আলোচনা সভা ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, নারী পুলিশ সদস্যদের নেতৃত্ব বিকাশ, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কর্মক্ষেত্রে সমতা ও নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

রবিবার (৭ জুন) চট্টগ্রাম দামপাড়া পুলিশ লাইন্সস্থ মেট্রোপলিটন শুটিং ক্লাবে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় চট্টগ্রাম রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রায় ৭০ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব অংশগ্রহণ করেন। “বিপিডব্লিউএন কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৪-২০২৭ বাস্তবায়ন” শীর্ষক এই কর্মশালা দেশব্যাপী ধারাবাহিক আলোচনা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়।
কর্মশালায় বিপিডব্লিউএনের প্রতিনিধিরা সংগঠনের কৌশলগত পরিকল্পনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। বিশেষ করে কর্ম-জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা, কর্মক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠা এবং নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

এছাড়া কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা জেন্ডার-রেসপনসিভ পুলিশিং, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কর্মঘণ্টা, বদলি প্রক্রিয়া এবং পদায়ন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খোলামেলা মতবিনিময় করেন। বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কেও সুপারিশ প্রদান করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার হাসান মোঃ শওকত আলী। কর্মশালার উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আমাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন অঙ্গীকার গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। তবে প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল সদস্যের জন্য একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও সহায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশ পুলিশ সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জনগণের আস্থা অর্জন এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে নারী পুলিশ সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের বিকল্প নেই।

কর্মশালায় বিপিডব্লিউএনের সভাপতি ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (লজিস্টিকস) নাসিমা আক্তার বলেন, “বিপিডব্লিউএনের মূল লক্ষ্য হলো নারী পুলিশের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, নেতৃত্ব বিকাশ এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা। বর্তমানে আমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল পুলিশ সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।”
তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী পুলিশ বাহিনীই জনগণকে আরও কার্যকর সেবা দিতে সক্ষম।
গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জ অফিসের পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) সঞ্জয় সরকার। তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশ পুলিশের জেন্ডার সমতা ও নারী ক্ষমতায়নের প্রতি চলমান অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং নারী পুলিশ সদস্যদের আরও বেশি নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ইউএন উইমেনের প্রতিনিধিরা জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সেবা প্রদান এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারা পুলিশ সদস্যদের জন্য নিরাপদ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিভিন্ন কৌশলও তুলে ধরেন।

ইউএন উইমেন প্রতিনিধি সাদিয়া তাসনীম বলেন, “বিপিডব্লিউএন যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, নারী পুলিশের অংশগ্রহণ, সক্ষমতা ও নেতৃত্ব বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ পুলিশে বিপিডব্লিউএনের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা, আজকের এই কর্মশালা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথকে আরও সুদৃঢ় করবে।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ ও বিপিডব্লিউএনের সঙ্গে ইউএন উইমেন দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নারী নেতৃত্ব বিকাশ, জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের জন্য ভুক্তভোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে এই অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

কর্মশালায় জানানো হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, জেলা কমান্ড এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মোট ১৭ হাজার ৯৮৮ জন নারী পুলিশ সদস্য কর্মরত রয়েছেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের অবদান ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ইউএন উইমেন পরিচালিত “জনপরিসর, কর্মক্ষেত্র এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নিরসন” প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পুলিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারী ও মেয়েদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

কর্মশালার সমাপনী পর্বে অংশগ্রহণকারীরা জেন্ডার সমতা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button