দেশহত্যাকান্ড

পটিয়ার দুই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন

জসিম উদ্দিন: নিখোঁজ শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার, পঙ্কজ শীল হত্যা মামলার দুই আসামি গ্রেফতার

চট্টগ্রামের পটিয়ায় সংঘটিত দুটি চাঞ্চল্যকর ও বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই দুই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে একটি ঘটনায় নিখোঁজ পাঁচ বছর বয়সী শিশু জায়হানের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য ঘটনায় পঙ্কজ শীল হত্যা ও তিলক চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টার মামলার দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, দুটি ঘটনাই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার পরপরই জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, আলামত বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের নিবিড় অনুসন্ধানের সমন্বয়ে দ্রুত রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। গত ১৬ জুন পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ শাহজাহান তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মো. জায়হান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরিবারের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পটিয়া থানা পুলিশ শিশুটির সন্ধানে মাঠে নামে। একইসঙ্গে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধারে পটিয়া থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার সমন্বয়ে একাধিক বিশেষ টিম গঠন করা হয়। শিশুটির সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করতে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন এবং বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দেশের বিভিন্ন থানায় বেতার বার্তা পাঠিয়ে শিশুটির সন্ধান চাওয়া হয়। তদন্তের একপর্যায়ে শিশুটির পরিবারের বসতঘর থেকে একটি মুক্তিপণ দাবিসংবলিত চিরকুট উদ্ধার করা হয়। ওই চিরকুটে হুমকিমূলক বার্তাও ছিল। শুরুতে ধারণা করা হয়, এটি অপহরণের ঘটনা হতে পারে। তবে তদন্তকারীরা চিরকুটটির লেখার ধরন, ভাষা এবং অন্যান্য বিষয় বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান।
চিরকুটের হাতের লেখা বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত তথ্য পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্তকারীরা সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করতে শুরু করেন। তদন্তে একপর্যায়ে পটিয়া শেভরন হাসপাতালে কর্মরত নার্স সাদিয়া সুলতানা নিহার হাতের লেখার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া চিরকুটের লেখার মিল পাওয়া যায়।পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাকে অপহরণ হিসেবে দেখানোর জন্য মুক্তিপণ দাবির নাটক সাজানো হয়েছিল।পুলিশ জানায়, আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৮ জুন রাত আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটে তাদের বসতঘরের পেছনের নর্দমার ময়লার স্তূপে অভিযান চালানো হয়। সেখানে একটি বস্তার ভেতর লুকিয়ে রাখা অবস্থায় শিশু জায়হানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্য ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। শিশুটির স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।এ ঘটনায় জড়িত তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।অন্যদিকে গত ৯ জুন পটিয়া উপজেলার চক্রশালা এলাকায় সংঘটিত পঙ্কজ শীল হত্যা ও তিলক চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই ঘটনায় একজন নিহত এবং একজন গুরুতর আহত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে জানা যায়, চক্রশালা এলাকার একটি সড়কে এক নারী ও এক পুরুষকে সন্দেহজনক অবস্থায় দেখে স্থানীয়রা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। পরে অভিযুক্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে পঙ্কজ শীল ও তিলক চক্রবর্তীর ওপর হামলা চালায়।গুরুতর আহত অবস্থায় পঙ্কজ শীলকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অপরদিকে গুরুতর আহত তিলক চক্রবর্তী বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পরপরই পটিয়া থানা পুলিশ এবং জেলা গোয়েন্দা শাখা যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।পরবর্তীতে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের ধারাবাহিকতায় গত ১৭ জুন কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকা থেকে মো. আব্দুল রহমান (২৩) নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।
পরদিন ১৮ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ এলাকা থেকে ফাতেমা বেগম নেহা (১৯) নামে অপর আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তের স্বার্থে ঘটনার সময় তাদের পরিহিত পোশাক জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এসব আলামত মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, দুটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের পেশাদার তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অল্প সময়ের মধ্যে আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা সম্ভব হওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ভিত্তি পেয়েছে।জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।তারা আরও জানান, চট্টগ্রাম জেলার কোথাও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তা দ্রুত উদঘাটন এবং অপরাধীদের গ্রেফতারে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা হবে। জনসাধারণের সহযোগিতা এবং আধুনিক তদন্ত পদ্ধতির সমন্বয়ে অপরাধ দমনে জেলা পুলিশ ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থানে থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button