অপরাধ

জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলা ঘিরে চট্টগ্রামে কোটি টাকার বাণিজ্য: আসামি করার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মুহাম্মদ জুবাইর: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তৈরি হয়েছে এক জটিল সমীকরণ। একদিকে রয়েছে শহীদ ও আহত পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার অন্তহীন অপেক্ষা, অন্যদিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে একটি বিশেষ মধ্যস্থতাকারী সিন্ডিকেট।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের আত্মত্যাগের স্পিরিটকে ঢাল বানিয়ে এক শ্রেণির অসাধু চক্র বিত্তশালী ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা মামলার ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য ফেঁদে বসেছে। এই ঢালাও ও কাল্পনিক আসামির ফাঁদে একদিকে যেমন নির্দোষ নাগরিকদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে, অন্যদিকে হাজারো আসামির ভিড়ে মূল খুনি ও স্নাইপারদের আইনি লুপহোল (ফাঁকফোকর) দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের সহিংসতাকেন্দ্রিক দায়ের হওয়া ১৫১টি মামলার নথিপত্র, মাঠপর্যায়ের গ্রাউন্ড রিয়েলিটি এবং আইনি মারপ্যাঁচে ক্ষতিগ্রস্তদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে তৈরি এই বিশেষ অনুসন্ধান।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর এফআইআর -এ নামীয় আসামির পাশাপাশি শত শত ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামি রাখা হচ্ছে। এই ‘অজ্ঞাতনামা’ শব্দটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে স্থানীয় দালাল ও টাউট সিন্ডিকেট।

মামলার এজাহার চূড়ান্ত হওয়ার আগে কিংবা আদালতে সিআর মামলা করার সময় টার্গেট করা ব্যক্তিদের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করে চক্রটি। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কাছে বার্তা পাঠানো হয়-‘এত লাখ টাকা দিলে তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে, অন্যথায় চার্জশিটে নাম ঢুকে যাবে।

সামাজিক সম্মানহানি ও গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেক নিরীহ ব্যবসায়ী বা সাধারণ চাকরিজীবী নিজেদের জমি বা শেষ সম্বল বিক্রি করে এই সিন্ডিকেটের দাবি মেটাচ্ছেন। ফলে টাকা দিলে এজাহারের খসড়া থেকে নাম গায়েব হয়ে যাচ্ছে, আর টাকা দিতে না পারলে আজীবন মেয়াদি আইনি মারপ্যাঁচে ফেঁসে যাচ্ছেন নির্দোষ নাগরিকেরা।

চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র রিয়াজউদ্দিন বাজার, খাতুনগঞ্জ এবং কোতোয়ালী থানা এলাকার একাধিক মামলার এজাহারে এমন সব অদ্ভুত অসঙ্গতি মিলেছে, যা পুরো বিচার বিভাগকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক শীর্ষ আমদানিকারক (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করা হলো না) জানান, আন্দোলনের পুরোটা সময় (জুলাই-আগস্ট) তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অথচ দেশে ফেরার পর তিনি জানতে পারেন নিউমার্কেট এলাকার একটি হত্যা মামলায় তাঁকে সরাসরি অস্ত্রধারী হিসেবে আসামি করা হয়েছে! পরবর্তীতে আইনি জটিলতা এড়াতে এবং ‘ক্লিন চিট’ নিশ্চিত করতে তাঁকে স্থানীয় এক প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বড় অঙ্কের আর্থিক সমঝোতা করতে হয়েছে।

বেশ কিছু মামলায় দেখা গেছে, বছরের পর বছর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করা প্রবাসী কিংবা ঘটনার আগেই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তির নামও হত্যাকাণ্ডের সরাসরি উসকানিদাতা হিসেবে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে শহীদ পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে জানা যায় অধিকাংশ আসামিকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেনই না। স্থানীয় কিছু অতি-উৎসাহী রাজনৈতিক কর্মী বা টাউট চক্র বাদীদের মানসিক ও আর্থিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এজাহারের খসড়া তৈরি করে দেয়।

মামলার প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর যখন অনেক ভুক্তভোগী পরিবার আইনি লড়াইয়ে নামেন, তখন বাদীরা পরবর্তীতে নিজেদের ‘ভুল’ স্বীকার করে আদালতে হলফনামা দিচ্ছেন যে, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে ওই ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছিল। আইনবিদদের মতে, এই ধরনের হলফনামা ও ঘনঘন এজাহার পরিবর্তন পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াকে হালকা ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নিহত জুতার দোকান কর্মচারী শহিদুল ইসলাম শহিদ হত্যা মামলার প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। ১৫১টি মামলার মধ্যে এটিই প্রথম চার্জশিট। এই মামলায় ২৩১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হলেও তদন্তের গভীরে গিয়ে দেখা গেছে, ত্রুটিপূর্ণ এজাহারের কারণে বহু নিরীহ মানুষকে মাসের পর মাস চরম আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তকারী কর্মকর্তারা যদি প্রথম থেকেই শতভাগ পেশাদারিত্ব না দেখান, তবে মূল খুনিরা এই বিশাল আসামির ভিড়ে সহজেই আড়াল হয়ে যাবে।

এই উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং মামলা বাণিজ্য রুখতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সাফ জানিয়ে দিয়েছে-সুনির্দিষ্ট এবং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ ছাড়া শুধু এজাহারে নাম থাকার কারণে জুলাই আন্দোলনের মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা যাবে না।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এবং জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি মামলার স্ক্রিনিং এখন ‘মাল্টি-লেয়ার’ বা বহুস্তরের তদারকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যাতে কোনো তৃতীয় পক্ষ বা প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতানোর সুযোগ না পায়।

২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্লোগানই ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন। কিন্তু জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এই মামলা বাণিজ্য শুধু তাঁদের আত্মত্যাগকেই কালিমালিপ্ত করছে না, বরং পুরো বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। কোনো একজন নিরপরাধ মানুষের চোখের জল যেন শহীদের রক্তকে বিতর্কিত করতে না পারে—অবিলম্বে এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনাই এখন চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের প্রধান দাবি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button