চট্টগ্রামে মেয়র- আওয়ামী লীগের ওসি মুখোমুখি, বগাকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে ঘিরে চট্টগ্রামে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। নগর ভবনে পুলিশি অভিযান, বগাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা, মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের বক্তব্য এবং খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের (ওসি) আব্দুর রহিমের ভূমিকা নিয়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যে বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) নগরের ঈদগাঁহ রূপসা বেকারি এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণে চসিকের ক্রাশ প্রোগ্রাম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি খুলশী থানার আওয়ামী লীগের ওসি আব্দুর রহিমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বগাকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার বিরোধিতা করেন। মেয়রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আব্দুর রহিম বাকলিয়া থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এরপরও কীভাবে তিনি বর্তমানে খুলশী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পেলেন-এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মেয়র।
মেয়র ডা. শাহাদাতের অভিযোগ, খুলশী থানায় আব্দুর রহিম দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো যুবলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ওসি আব্দুর রহিম বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বগা প্রসঙ্গে মেয়র ডা. শাহাদাত বলেন, ওয়াকিল হোসেন গত ১৭-১৮ বছর ধরে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও তিনি ‘যোদ্ধা’ হিসেবে অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেন মেয়র। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বগার বিরুদ্ধে প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০টি মামলা দেওয়া হয়েছিল।
যদিও পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা যায়, বগার বিরুদ্ধে বর্তমানে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে খুলশী, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।বগা চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে গত ৮ জুন তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি খুলশীতে কিশোর হৃদয় হত্যার ঘটনায় করা মামলাকে কেন্দ্র করেও ওসি আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন মেয়র। ডা. শাহাদাতের দাবি, ওই মামলার আসামি কামরুলকে পুলিশ মারধর করে বগা ও তার ভাইয়ের নাম বলতে বাধ্য করেছে-এমন অভিযোগ নিয়ে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বগার দুই ভাই তার কাছে এসেছিলেন।মেয়র বলেন, তার কাছে আসা বগার দুই ভাই অভিযোগ করেছেন, কামরুলকে মারধর করে জোরপূর্বক বগার নাম বলানো হয়েছে। পরে বগা ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
মামলার একজন প্রত্যক্ষদর্শীও একই ধরনের কথা বলেছেন বলে দাবি করেন মেয়র। এমনকি মামলার বাদীও বগাকে কামরুলের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেননি বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, বগা নিজে তার কাছে আসেননি; তার দুই ভাই অভিযোগ নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। বগা কোনো মামলার আসামি বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত হলে তাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মেয়রের ভাষ্য, তিনি প্রকাশ্যেই গাড়িতে উঠেছেন এবং নগর ভবনে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন যে বগা তার গাড়িতে উঠেছেন, তাহলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন বলেও মন্তব্য করেন মেয়র।এর আগে মঙ্গলবার রাতে বগাকে গ্রেপ্তার করতে নগর ভবনে অভিযান চালায় পুলিশ। প্রায় এক ঘণ্টা তল্লাশি চালিয়েও তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানা যায়।পুলিশের ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে নগর ভবনে হট্টগোল এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশ মেয়রের বাগ্বিতণ্ডার অভিযোগ ওঠে। সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগও উঠে আসে।
একই সময়ে বগা কীভাবে নগর ভবনে এলেন এবং পুলিশের অভিযানের আগেই কীভাবে সেখান থেকে বের হয়ে গেলেন-তা নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।পুলিশের দাবি, বগাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যেই নগর ভবনে অভিযান চালানো হয়েছিল। অন্যদিকে মেয়রের বক্তব্য ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে এ অভিযানকে ঘিরে ভিন্ন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
নগর ভবনে পুলিশের অভিযান নিয়ে খুলশী স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা তার ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন পুলিশের আসল উদ্দেশ্য কি বগাকে গ্রেপ্তার করা, নাকি মেয়রকে বিতর্কিত করা?তার দাবি, পুলিশ যদি সত্যিই বগাকে গ্রেপ্তারে আন্তরিক হতো, তাহলে তাকে আগেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব ছিল। বগা নগর ভবনে পৌঁছানোর আগে নগরীর বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করলেও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে কেন আটক করা হয়নি-এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।ওই নেতা আরও দাবি করেন, মেয়রের কার্যালয়ে অভিযান চালানোর আগে পুলিশ মেয়রের সহযোগিতা চাইলে পরিস্থিতি অন্যভাবে সমাধান করা যেত।তবে এটি ওই নেতার ব্যক্তিগত মতামত বলেও তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের আরেক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, বগা আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাসী’ নন; বরং দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের একজন কর্মী এবং জুলাই আন্দোলনের একজন ‘যোদ্ধা’।তিনি মেয়র ডা. শাহাদাতের বক্তব্য তুলে ধরে ওসি আব্দুর রহিমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।ওই নেতার পোস্ট অনুযায়ী, মেয়র বলেছেন-কোনো সাংবাদিক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে বগা তার গাড়িতে ছিলেন, তাহলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।
চট্টগ্রামের এক কৃষক দল নেতাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওসি আব্দুর রহিমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।তার বক্তব্য, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ওসি আব্দুর রহিম বিভিন্ন অনিয়ম দেখলেও তখন প্রতিবাদ করেননি। বর্তমানে তিনি বিএনপিকে দুর্বল করার কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন কি না-এমন প্রশ্ন তোলেন ওই নেতা। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে বসে থাকবে না।
অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক সক্রিয় নেতা তার ফেসবুক পোস্টে চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে খুলশী থানার আওয়ামী লীগের ওসি আব্দুর রহিমকে অবিলম্বে বরখাস্তের দাবি জানিয়েছেন।
তার দাবি, ওসি আব্দুর রহিম বাকলিয়া থানায় দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।পোস্টে আরও অভিযোগ করা হয়, বাকলিয়া থানায় দায়িত্ব পালনকালে চেকপোস্টের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি, অপরাধী ও মাদককারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগসহ নানা অনিয়মে ওসির সম্পৃক্ততা ছিল।এ ছাড়া মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাকে খুলশী থানায় আনা হয়েছে এবং বিএনপিকে ‘ধ্বংস করার’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি কাজ করছেন-এমন অভিযোগও ওই নেতার পোস্টে করা হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খুলশীর ওয়্যারলেস এলাকায় বগাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় খুলশী থানার ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে।পুলিশের দাবি, ওই সময় বগা তার বাসার একটি গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যান।
এ ছাড়া সম্প্রতি খুলশীতে কিশোর হৃদয় হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ‘সেভেন স্টার’ নামে একটি কিশোর গ্যাং পরিচালনায় বগা ও তার ভাইয়ের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে ৪ অক্টোবর ওই গ্যাংয়ের তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।তবে বগা ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কী বক্তব্য রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একদিকে পুলিশের দাবি-বগার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও মামলা রয়েছে এবং তাকে আইনের আওতায় আনতেই অভিযান চালানো হয়েছে। অন্যদিকে মেয়র ডা. শাহাদাত এবং বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা প্রশ্ন তুলছেন, পুলিশি তৎপরতা আসলে নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না। বিশেষ করে খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিমের অতীত দায়িত্ব এবং তার বর্তমান ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে বগাকে ঘিরে নগর ভবনে পুলিশের অভিযান এবং মেয়রের গাড়িতে করে তাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।মেয়রের দাবি, সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার ‘ভালো ইমেজ নষ্ট’ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব করা হচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, বগাকে গ্রেপ্তার করাই ছিল তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য। ফলে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে-নগর ভবনে পুলিশের অভিযানটি কেবল একজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের আইনগত তৎপরতা ছিল, নাকি এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সমীকরণও কাজ করেছে?



