নূরীয়া দরবারে বৃহৎ ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, উপকৃত শতাধিক মানুষ
নিজস্ব প্রতিবেদক: মানবসেবা, আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সমন্বয়ে চট্টগ্রামের রুবিগেইটস্থ ঐতিহ্যবাহী ওষখাইনীরি নূরীয়া বিষু দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘খাইমাতু রুফাইদা (রা.) ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প-২০২৬’। খাজা শাহ্ নূর দরবেশ মওলা (রা.)-এর ১৪ জিলক্বদ চন্দ্রবার্ষিকী ফাতেহা শরীফ উপলক্ষে আয়োজিত এই মহতী কর্মসূচি স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে এবং মানবকল্যাণে দরবারের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
শনিবার (২ মে) দিনব্যাপী আয়োজিত এই মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করে আশেকানে পাক পঞ্জেতন রজা নূরীয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট। সকাল থেকেই দরবার প্রাঙ্গণে রোগীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা নিতে এখানে সমবেত হন। নারী, শিশু, বয়স্কসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ সেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন।
এই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের অভিজ্ঞ ও খ্যাতনামা চিকিৎসকরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। চিকিৎসাসেবার পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত,মেডিসিন, হৃদরোগ, গাইনি ও প্রসূতি, শিশু, অর্থোপেডিক, বাতব্যথা, মানসিক স্বাস্থ্য, নাক-কান-গলা (ইএনটি), চক্ষু, নিউরোলজি, ফিজিওথেরাপি এবং চর্মরোগসহ প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। চিকিৎসকরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও যত্নসহকারে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই ক্যাম্পে প্রায় চার শতাধিক রোগীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধও বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়, যা দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের জন্য বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অনেক রোগী প্রথমবারের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন ও ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন নূরী সিদ্দিকী আল কুরাইশী। তিনি তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে বলেন, “‘খাইমাতু রুফাইদা (রা.)’ নামটি শুধু একটি নাম নয়, এটি মানবসেবার এক ঐতিহাসিক প্রতীক। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নারী সেবিকা হিসেবে হযরত রুফাইদা আল আসলামিয়া (রা.) যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আজও মানবতার জন্য অনুকরণীয়। আমরা তাঁর আদর্শ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “সুফিয়ায়ে কেরামের দরবারসমূহ শুধু আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্র নয়, বরং সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র। যুগে যুগে এই দরবারগুলো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, কখনো খাদ্য সহায়তা, কখনো চিকিৎসা সেবা, আবার কখনো শিক্ষা সহায়তার মাধ্যমে। বর্তমান সমাজে এই ধারা আরও বিস্তৃত করা সময়ের দাবি।”
অনুষ্ঠানে মেহমানে আলা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতকানিয়া দক্ষিণ শুকছড়ি চিশতীয়া আলীয়া দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন হযরত সৈয়দ নাসেরুল হক চিশতী। তিনি তাঁর বক্তব্যে দরবারভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “মানবসেবা ছাড়া প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা পূর্ণতা পায় না। এই ধরনের উদ্যোগ সমাজে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।”
প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ফিনিশ একাডেমির পিএইচডি ফেলো ড. সেলিম জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। দরবারভিত্তিক এই উদ্যোগগুলো স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর।”
বিশেষ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ সাদী, ড. শাহীনুর রহমান ও ড. নূরুল আলম। তাঁরা বলেন, আউলিয়া কেরামের দরবারসমূহ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং বর্তমান সময়েও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।তারা এ ধরনের উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শাহজাদা তানজিদ হাশেমী, শাহজাদা মাওলানা মুহাম্মদ আকমল রেজা, হাসান মুহাম্মদ কফিলুদ্দীন, শাহজাদা সরওয়ার হোসেন মিরু, পীরজাদা হাফেজ খায়রুল বশর ছিদ্দিকী ফয়সল, পীরজাদা নঈম উদ্দিন রজায়ীসহ বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম, সুধীজন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
পুরো অনুষ্ঠানটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করেন মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহমান নূরী। মিলাদ ও কিয়াম পরিচালনা করেন শাহজাদা সাহিলুর রশিদ নূরী। শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে মাওলানা মঈনুদ্দীন নূরী আল কুরাইশীর দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
এই মহতী আয়োজন সফল করতে সার্বিক সহযোগিতা করেন ওষখাইন গাউছিয়া রহমানিয়া মাওলা মঞ্জিল এবং দরবার শরীফের নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় পুরো আয়োজনটি সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিতভাবে সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এ ধরনের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প তাদের জন্য অত্যন্ত উপকারী, বিশেষ করে যারা অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন না। তারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ভবিষ্যতেও নিয়মিত এ ধরনের আয়োজনের দাবি জানান।
সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের মানবকল্যাণমূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হবে এবং সমাজের আরও বেশি মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবেন।



