
নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীর দাবির বিপরীতে চট্টগ্রাম শহরের রাজনীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাবেক এমপি ফজলে করিমের সরাসরি সম্পৃক্ততার নতুন তথ্য-প্রমাণ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী দাবি করেছিলেন যে, ফজলে করিম রাউজানের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন এবং চট্টগ্রাম শহরের রাজনীতির সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। আইনজীবীর এই দাবি ছাত্রসমাজ ও স্থানীয় সচেতন মহলের তীব্র ক্ষোভ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
প্রাপ্ত নথিপত্র, স্থানভিত্তিক তথ্য ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম শহরের রাজনীতি, প্রভাব বিস্তার এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অস্ত্র ও সন্ত্রাসী সরবরাহের একাধিক গুরুতর নমুনা উঠে এসেছে।
নগরীর কোতোয়ালী ও খুলশীর বাসভবন কেন্দ্রিক অপতৎপরতা: চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন পাথরঘাটায় অবস্থিত ফজলে করিমের বাসভবনটি ছিল তার মূল রাজনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্রস্থল। অভিযোগ রয়েছে, গত জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে এই পাথরঘাটার বাসভবন থেকেই নগরীজুড়ে অস্ত্র ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী ক্যাডার প্রেরণ করা হয়েছিল। এছাড়া নগরীর অভিজাত এলাকা খুলশীতেও তাদের আরেকটি বাসভবন রয়েছে, যেখানে তিনি নিয়মিত অবস্থান করতেন এবং আড়ালে থেকে শহরের রাজনৈতিক চাল ও প্রভাব বিস্তার করতেন।
শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে অপহরণ ও গুমের ঘটনা: রাজনৈতিক নিপীড়নের অংশ হিসেবে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ফজলে করিম বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। খুলশী থানা এলাকা থেকে জাফর চেয়ারম্যানকে গুম করা এবং চট্টগ্রাম শহরস্থ চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা এলাকা থেকে ছাত্রদল নেতা নুরুকে তুলে নেওয়ার পেছনেও ফজলে করিম ও তার ক্যাডার বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল বলে ভুক্তভোগী ও ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।উল্লেখ্য, জাফর চেয়ারম্যানকে গুমের মামলাটি বর্তমানে ট্রাইবুনালে চলমান আছে। অন্যদিকে নুরু হত্যা মামলাটি CID তে তদন্তাধীন।
শহরের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের সাথে ওঠাবসা: নথিপত্রে দেখা যায়, বিগত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নগরীর নিউমার্কেট মোড়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি চালানো চসিক জামালখান ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের সাথে কোতোয়ালীস্থ পাথরঘাটার বাসভবনে ফজলে করিমের গোপন ও নিয়মিত বৈঠক হতো। পাশাপাশি জুলাই গণহত্যার ওয়ারেন্টভুক্ত অস্ত্রধারী আসামি হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর এবং ছাত্র হত্যার অভিযুক্ত নুরুল আজিম রনিকে সাথে নিয়ে নগরীর বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রথম সারিতে অবস্থান করতেন ফজলে করিম ও তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী।
বিদেশে ফারাজের সিন্ডিকেট ও রাউজান থেকে শহর অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত: তাছাড়া বর্তমানে বিদেশে বসে মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো আন্তর্জাতিক আওয়ামী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী। উদ্দেশ্য হলো, দেশে চক্রান্তমূলকভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বায়েজিদ লিংক রোড এলাকা থেকে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টাকালে গ্রেফতার হওয়া ৪ ব্যক্তির পরিচয় উন্মোচনের পর এই চক্রান্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রেফতারকৃত চারজনই রাউজানের বাসিন্দা। অর্থাৎ, জুলাই গণহত্যার মতোই আবারও রাউজান থেকে সন্ত্রাসী ও ক্যাডার পাঠিয়ে চট্টগ্রাম শহরকে অস্থিতিশীল করার পুরোনো ছক বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
নগর রাজনীতি ও চসিক প্রশাসনে নজিরবিহীন প্রভাব: ফজলে করিম কেবল রাউজানে সীমাবদ্ধ না থেকে চট্টগ্রাম নগরীর রাজনীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে সাবেক মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীনের সমর্থনে প্রচার ও কেন্দ্র পরিদর্শন করেন তিনি। চসিকের সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত মেয়র গিয়াস উদ্দিন, আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শাহাবুদ্দিনসহ চসিকের অন্যান্য কাউন্সিলর ও প্রকৌশলীরা পাথরঘাটাস্থ বাসভবনে গিয়ে তার সাথে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ করতেন। এছাড়া সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প এবং রেলওয়ের জমি সংস্কার নিয়েও নগর কর্মকর্তাদের সাথে তিনি নিজ বাসভবনেই বৈঠক করতেন।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে উপস্থিতি: চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ড মাঠে আওয়ামী লীগের মহাসমাবেশের প্রস্তুতি তদারকি, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে সংবাদ সম্মেলন, কেন্দ্র ও নগর নেতাদের নিয়ে যৌথ প্রতিনিধি সভা, এবং মেট্রোপলিটন শুটিং ক্লাবের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বৈঠক পরিচালনা করতেন তিনি। তাছাড়া জে এম সেন হলে রাস মহোৎসব, এস অ্যান্ড ডি মজুমদার ফাউন্ডেশনের বস্ত্র বিতরণ, চট্টগ্রাম কলেজ পুনর্মিলনী ও শোভাযাত্রা, চবি অ্যালামনাই অনুষ্ঠান এবং নগরীর বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের অনুষ্ঠানেও তার নিয়মিত যাতায়াত ও সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ছাত্রসমাজের মতে, ট্রাইব্যুনালে ফজলে করিমের আইনজীবীর করা “শহরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থাকার” বক্তব্যটি একটি পরিষ্কার অসত্য দাবি। পাথরঘাটা ও খুলশীর বাসভবন কেন্দ্রিক তার গতিবিধি এবং শহরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চিত্রই প্রমাণ করে তিনি নগরীর রাজনীতিতে কতটা প্রভাবশালী ও সক্রিয় ছিলেন।



