চট্টগ্রামে যুবদল কর্মী জীবন হত্যা মামলায় নগর যুবদল নেতা জুয়েল ও সহযোগী আরমান গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় যুবদল কর্মী আবু ইউসুফ ওরফে জীবন হত্যা মামলায় নগর যুবদলের প্রচার সম্পাদক জিল্লুর রহমান জুয়েল ও তাঁর সহযোগী মো. আরমানকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স টিম (এসআরবি)। শনিবার (১ নভেম্বর) বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
রোববার (২ নভেম্বর) এসআরবির মুখপাত্র সহকারী পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দায়ের করা যুবদল কর্মী আবু ইউসুফ ওরফে জীবন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি জিল্লুর রহমান জুয়েল এবং তাঁর সহযোগী মো. আরমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রামের চান্দগাঁও ক্যাম্পে ব্রিফিং করার কথা রয়েছে এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমানের।
হামলার দুই দিন পর হাসপাতালে মৃত্যু
মামলার বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ অক্টোবর দিবাগত রাতে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে আবু ইউসুফ ওরফে জীবনকে ছুরিকাঘাত ও পায়ে গুলি করার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় এলাকাবাসী তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর ডান পা কেটে ফেলতে হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত ২৯ অক্টোবর সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় যুবদল নেতা জিল্লুর রহমান জুয়েল, ইকরাম বাবু, আরমানসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হত্যার অভিযোগ
নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পক্ষ পরিবর্তন এবং অনুসারীদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে জীবনের ওপর হামলা চালানো হয়। তাঁদের দাবি, নগর যুবদলের প্রচার সম্পাদক জিল্লুর রহমান জুয়েলের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন জীবন। পরবর্তী সময়ে তিনি জুয়েলের পক্ষ ছেড়ে অন্য একটি রাজনৈতিক বলয়ে যুক্ত হওয়ায় বিরোধের সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে অভিযোগ পরিবারের। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জিল্লুর রহমান জুয়েল।
মৃত্যুর আগে হামলাকারীদের নাম উল্লেখ
হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার সময় জীবন অভিযোগ করেছিলেন, ইকরাম বাবু ও আরমান তাঁকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করেছেন। এ সময় তাঁর দেওয়া বক্তব্যের একটি ভিডিও পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় জীবনসহ চার থেকে পাঁচজন কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচিত ইকরাম বাবু, আরমান, মেহেদী ও নাবিদসহ ১৩ থেকে ১৪ জন সেখানে গিয়ে অতর্কিত হামলা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলাকারীদের কয়েকজনের হাতে ছুরি ও পিস্তল ছিল এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের মাথায় হেলমেট ছিল বলেও দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
রাজনৈতিক পক্ষ পরিবর্তন নিয়ে বিরোধের দাবি
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গত দুই বছর ধরে জীবন জিল্লুর রহমান জুয়েলের অনুসারী হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। সম্প্রতি তিনি জুয়েলের পক্ষ ছেড়ে চট্টগ্রাম নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরুজ্জামান শিমুলের সঙ্গে যুক্ত হন। এ নিয়ে জুয়েলের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে দাবি সূত্রগুলোর।
নিহত জীবনের মা মোছাম্মৎ শামসুন্নাহার অভিযোগ করেন, জুয়েলের সঙ্গে রাজনীতি করার জন্য তাঁর ছেলেকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু জীবন রাজনীতি কিংবা চাঁদাবাজিতে জড়াবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, এই বিরোধের পরিণতিতেই ছেলেকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
এদিকে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি জিল্লুর রহমান জুয়েল ও তাঁর সহযোগী আরমানকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, হামলায় অংশ নেওয়া অন্য ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন নিহতের স্বজনরা। পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।



