রাজনীতি

মোশাররফের জানাজায় এক কাতারে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল ১১টায় নগরের জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জানাজা ঘিরে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় শোকাবহ ও আবেগঘন পরিবেশ। ভোর থেকেই নগরের বিভিন্ন এলাকা, মিরসরাইসহ জেলার নানা প্রান্ত থেকে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক জমিয়াতুল ফালাহ প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন।

জানাজার আগে ও পরে পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন এলাকা। একইসঙ্গে ‘মোশাররফ ভাই, তোমায় ভুলবো না’, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন অমর হোক’ এমন নানা স্লোগানও দিতে দেখা যায়। প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো দেখতে এসে অনেক নেতাকর্মী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কফিন ছুঁয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন, আবার কেউ ফুল হাতে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন দীর্ঘ সময়।

জানাজার আগে মরদেহবাহী গাড়ি জমিয়াতুল ফালাহ প্রাঙ্গণে পৌঁছালে মুহূর্তেই মানুষের ঢল নামে। চারদিকে হাজারো মানুষের ভিড়ে পুরো এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কফিন ফুলে ফুলে ঢেকে যায়। এ সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

জানাজায় অংশ নেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও বিএনপির হেভিওয়েট নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন, সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, প্রয়াত নেতার বড় ছেলে সাবেদুর রহমান সমুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা। এছাড়াও বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকেও জানাজায় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে বিভিন্ন দলের নেতাদের একসঙ্গে উপস্থিতি অনেকের নজর কাড়ে।

চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন দেশের একজন অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক। বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নে তাঁর অবদান মানুষ আজীবন স্মরণ রাখবে। রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও তিনি ছিলেন সবার শ্রদ্ধার ব্যক্তি।”
সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে মোশাররফ হোসেন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে হারালো।”

জানাজা ঘিরে জমিয়াতুল ফালাহ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। বিভিন্ন বয়সী মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল শোকমিছিলে।

১৯৪৩ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। লাহোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন সময়েই ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তিনি। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। মিরসরাই আসন থেকে মোট ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান। দীর্ঘদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জমিয়াতুল ফালাহে জানাজা শেষে কফিনবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি তাঁর নিজ এলাকা মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখানে বাদ আসর ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

মৃত্যুকালে তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে চট্টগ্রামজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর প্রস্থানকে অনেকে একটি যুগের অবসান হিসেবে দেখছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button