রাজধানী

নিকুঞ্জের একমাত্র খেলার মাঠ দখলে নিয়েছে হকার ও চাঁদাবাজরা

মো: জাকিরুল ইসলাম: যে মাঠে শিশুদের ছোটাছুটি করার কথা, বিকেলে কিশোরদের ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠার কথা, যে মাঠ ঘিরে থাকার কথা একটি আবাসিক এলাকার প্রাণচাঞ্চল্য—সেই মাঠই এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে দখলের কবলে। রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকার একমাত্র খেলার মাঠটি ঘিরে এমনই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মাঠের চারপাশে একের পর এক ভাসমান দোকান ও হকারের বিস্তার ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, মাঠের একাংশে সাময়িকভাবে দোকান বসানোর সুযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে মাঠের ভেতরের বড় অংশ দখলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে মাঠের পাশের প্রায় ১০ শতাংশ জায়গায় দোকান বসানো হলেও পর্যায়ক্রমে সেগুলো মাঠের ভেতরের দিকে সম্প্রসারিত হয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ জায়গা দখলের পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই দখলদারত্বের পেছনে রয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র। তাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহারকারী কিছু চিহ্নিত পদধারী নেতা ও চাঁদাবাজের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে মাঠ রক্ষায় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে গিয়েও নানা বাধার মুখে পড়ছেন।
নিকুঞ্জের এই মাঠ শুধু শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জায়গা নয়; এটি এলাকার সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ সেই মাঠের চারপাশে এখন খেলাধুলার পরিবেশের চেয়ে দোকানপাটের বিস্তারই বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

এর আগে নিকুঞ্জ-২ কল্যাণ সমিতির ফুডকোর্ট সাব-কমিটির আহ্বায়ক এ টি এম জসিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন সমিতির প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হয়। ওই আবেদনে সাব-কমিটির সাত সদস্য স্বাক্ষর করেন।

আবেদনে বলা হয়, মাঠের আশপাশের হকার ও দোকানদারদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সেখানে বিশৃঙ্খলা, নিরাপত্তাহীনতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এতে মাঠের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সমিতির কার্যক্রম পরিচালনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর নিকুঞ্জের এই মাঠের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। মাঠের উত্তর ও পূর্ব পাশ ঘিরে দোকানপাট বসাতে শুরু করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারী চক্র। একপর্যায়ে এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে প্রশাসন ফুডকোর্ট অপসারণে উদ্যোগ নেয়। তখন মাঠটি দখলমুক্ত হওয়ার ঘটনায় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছিল।

কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই মাঠের পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিম পাশ ঘিরে আবারও দোকানপাট বসানো শুরু হয়। বর্তমানে দোকানগুলো মাঠের সীমানার পাশে থাকলেও ক্রমেই ভেতরের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মাঠ রক্ষায় প্রতিবাদ করতে গিয়েও অনেককে নাজেহালসহ নগ্ন ট্যাগিং বুলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, কল্যাণ সমিতি কিংবা এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের এসব ভাসমান দোকানের ওপর কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। উল্টো প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, শারীরিকভাবে হেনস্তা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ কারণে অনেক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করতে চাইলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। বিশেষ করে সাধারণ খেলোয়াড় ও স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নিকুঞ্জের মাঠ রক্ষার দাবিতে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বারবার আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির পরও মাঠটি স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি জাহিদ ইকবাল বলেন, “কিছুদিন আগে আমরা নিকুঞ্জের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য প্রশাসনকে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলাম। সেই সময় পার হয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ‘আসছি, আসছি’ বলা হচ্ছে। এলাকার মানুষ এখন আর আশ্বাস শুনতে চায় না, তারা বাস্তবে উচ্ছেদ অভিযান দেখতে চায়। জনস্বার্থে এই মাঠসহ নিকুঞ্জের সকল অবৈধ স্থাপনা দখলমুক্ত করা জরুরি।”

অন্যদিকে, খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন মাঠের পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “নিকুঞ্জের খেলার মাঠ ও এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনস্বার্থ রক্ষায় পুলিশ সবসময় আন্তরিক ও তৎপর রয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাফেরা, শিশুদের খেলাধুলা এবং এলাকার পরিবেশ সুন্দর রাখতে অবৈধ দখলদারত্বের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এলাকাবাসীর নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বদা পাশে রয়েছে।”

এলাকাবাসীর দাবি, নিকুঞ্জের কোনো সড়ক কিংবা খেলার মাঠে ভাসমান হকার ও অবৈধ দোকানপাট দেখতে চান না তাঁরা। তাঁদের মতে, জনসাধারণের চলাচলের জায়গা এবং শিশুদের খেলার মাঠ কোনোভাবেই ব্যক্তিস্বার্থ বা অবৈধ ব্যবসার জায়গা হতে পারে না।

তবে দীর্ঘদিন ধরে মাঠের আশপাশে দোকান বসিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন কেউ কেউ। তাঁদের জন্য আইনসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু জীবিকার প্রশ্নকে সামনে রেখে একটি আবাসিক এলাকার একমাত্র খেলার মাঠ দখল করে রাখার সুযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাসিন্দাদের প্রশ্ন, একটি আবাসিক এলাকায় শিশুদের জন্য একটি খেলার মাঠও কি নিরাপদ রাখা যাবে না?
আজ যারা মাঠে খেলতে পারছে না, আগামী দিনে তারাই হয়তো জানবে না—এই মাঠ একসময় তাদেরই ছিল। একটি প্রজন্মের কাছ থেকে খেলাধুলার জায়গা কেড়ে নেওয়া মানে শুধু কিছু জমি হারানো নয়, তাদের শৈশব, সুস্থ বিনোদন ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগও সংকুচিত করে দেওয়া।

তাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসন আর আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নিকুঞ্জের একমাত্র খেলার মাঠটি সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করে শিশু-কিশোরদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে তাদের অধিকার।
কারণ, একটি মাঠ শুধু খেলার জায়গা নয়—এটি একটি এলাকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন বেড়ে ওঠার জায়গা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button