পুষ্পধারা হাউজিংয়ের নতুন জালিয়াতির ফাঁদ: নেপথ্যে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক চক্র ও ডেসটিনির কুশীলবরা

স্টাফ রিপোর্টার: জমি বিক্রির চটকদার প্রলোভনে অনুমোদনহীন ও সম্পূর্ণ ভুয়া একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে নিরীহ গ্রাহকদের প্রতারণার জালে ফেলছে বিতর্কিত আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘পুষ্পধারা প্রপার্টিজ লিমিটেড’। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর ‘পুষ্পধারা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার ভুয়া দাবি তুলে ক্রেতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। “বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে জমি কিনলে ভবিষ্যতে বিপুল মূল্য পাওয়া যাবে”—এমন বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ করে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কথিত ‘পুষ্পধারা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র কোনো সরকারি অনুমোদন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) স্বীকৃতি নেই। শিক্ষা কার্যক্রম বা নিজস্ব ক্যাম্পাসের ন্যূনতম অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও পুষ্পধারার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের সহযোগী সংস্থা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০’ অনুযায়ী সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয় দিয়ে প্রচারণা চালানো বা জমি বিক্রি করা স্পষ্টত আইনি অপরাধ।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, পুষ্পধারার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আলীনূর ইসলাম ও চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান এই কথিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতাদের কাছ থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা চালান। সাবেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সাথে এই চক্রের গভীর যোগসাজশের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চক্রটি রাতারাতি নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার বানানোর আশ্বাস দিয়েও একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই জালিয়াতি সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বেশ কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ফয়সাল আহমেদ খান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত মো. মঈন খান, ‘ডেসটিনি মামুন’ হিসেবে পরিচিত মো. হাসিবুল হক, মো. জুলফিকার আলী, এনামুল হক, মো. আতিকুর রহমান, মো. মমিনুল ইসলাম মিয়াজী, সৈয়দ মাসুদুর রহমান, তুষার দেওয়ান এবং মোহাম্মদ আলী রেজা। এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্য বজায় রাখতে খায়রুজ্জামান রাজ ওরফে ‘হিজড়া রাজ’ নামের এক ব্যক্তি চক্রটির হয়ে কাজ করছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
পুষ্পধারা প্রপার্টিজের এই অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদককে গুম-খুন ও ভুয়া মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে পুষ্পধারা প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলীনূর ইসলাম এবং চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
(পুষ্পধারা প্রপার্টিজের ভুয়া প্রকল্প, অবৈধ সম্পদের তথ্য ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নিয়ে বিস্তারিত দেখুন পরবর্তী পর্বে।)



