বাবুই পাখির “অস্তিত্বই” যে আজ হুমকির মুখে

0
136

“‘স্বাধীনতার সুখ”গল্পেই কি শুধু রয়ে যাবে বাবুই পাখির বাসা?বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই- কুঁড়েঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে।’ বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তাই ?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।” – কবি রজনীকান্ত সেনের লেখা অমর এই কবিতাটি নিশ্চই আপনার এখনো মনে আছে। কবিতাটি তৃতীয় শ্রেণিতে বাংলা পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত থাকায় কবিতাটি পড়ে শিক্ষার্থীরা বাবুই পাখি ও বাবুই পাখির শিল্পনিপুণতার কথা জানতে পারলেও বাবুই পাখির অস্তিত্বই যে আজ হুমকির মুখে।

বাবুই পাখির বাসা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি মজবুত। কথিত আছে, রাতে বাসায় আলো জ্বালার জন্য বাবুই পাখি জোনাকি পোকা ধরে এনে বাসায় গুঁজে এবং সকাল হলে জোনাকি পোকাদের আবার ছেড়েও দেয়। বাবুই পাখির বাসা দেখতে একদম উল্টানো কলসির মতো। বাসা বানাবার জন্য বাবুই পাখি খুব পরিশ্রম করে। ঠোঁট দিয় ঘাসের আস্তরণ সারায়। যত্ন করে পেট দিয়ে ঘষে (পালিশ করে) গোল অবয়ব মসৃণ করে। সাধারণত তালপাতা, ঝাউ, খড়, ও কাশবনের লতাপাতা দিয়েই বাবুই পাখি উঁচু তালগাছে বাসা বাঁধে। উঁচু তালগাছে বাঁধা খড়কুটোর সেই বাসা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ও মজবুত হয় এবং প্রবল ঝড়েও তা পড়ে না। বাবুই পাখির শক্ত বুননের বাসা শিল্পের অনন্য সৃষ্টি। যা একজন মানুষের কাছে সহজে টেনে ছেঁড়া সম্ভব না। বাসা তৈরির শুরুতে বাসায় দুটি নিম্নমুখী গর্ত থাকলেও পরে একদিক বন্ধ করে বাবুই পাখিরা তাতে ডিম রাখার জায়গা তৈরি করে। অপর দিকটি লম্বা করে তৈরি করে প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ।

বাসা তৈরি করার পর সঙ্গী খুঁজতে যায় অন্য বাসায়। সঙ্গী পছন্দ হলে পুরুষ বাবুই পাখি স্ত্রী বাবুই পাখিকে সাথী বানানোর জন্য ভাব-ভালোবাসা নিবেদন করে এবং বাসা তৈরির কাজ অর্ধেক হতেই স্ত্রী বাবুইকে কাঙ্ক্ষিত বাসা দেখায়। কারণ বাসা পছন্দ হলেই কেবল এদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। স্ত্রী বাবুই পাখির বাসা পছন্দ হলে বাকি কাজ শেষ করতে পুরুষ বাবুই পাখির সময় লাগে মাত্র চার থেকে পাঁচদিন। পুরুষ বাবুই পাখি এক মৌসুমে প্রায় পাঁচ ছয়টি বাসা তৈরি করতে পারে। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরণায় পুরুষ বাবুই পাখি মনের আনন্দে শিল্পসম্মত ও নিপুণভাবে বিরামহীন বাসা তৈরির কাজ শেষ করে। তবে প্রেমিক বাবুই পাখি যতই ভাব-ভালোবাসা প্রকাশ করুক না কেন, প্রেমিকা বাবুই পাখির ডিম দেওয়ার সাথে সাথেই প্রেমিক বাবুই পাখি আবার খুঁজতে থাকে অন্য সঙ্গী। বাবুই পাখি সাধারণত খুটে খুটে বিভিন্ন ধরনের বীজ, ধান, ভাত, পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু-রেণু ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে।
ঢাকার নিকটবর্তী ধামরাই উপজেলাসহ দেশের  বিভিন্ন জনপদেই প্রায় বিলুপ্তির পথে প্রকৃতির বয়নশিল্পী বাবুই পাখি ও তার বাসা। আগের মতো এখন আর প্রকৃতিপ্রেমীদেরও চোখে পড়েনা বাবুই পাখি, চোখে পড়েনা বাবুই পাখির তৈরি দৃষ্টিনন্দন ছোট্ট বাসা ও বাসা তৈরির নয়নাভিরাম নৈসর্গিক দৃশ্য। একসময় দেশের বিভিন্ন জনপদে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সারি সারি উঁচু তালগাছের পাতার সঙ্গে বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা দেখা যেত। কালের বিবর্তনে এখন তা আর সচরাচর চোখে পড়ে না। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা দৃষ্টিনন্দন বাবুই পাখি ও তাদের নিজের তৈরি বাসা আজ বিলুপ্তপ্রায়। এছাড়াও অনেক অসচেতন মানুষ এদের বাসা ভেঙে ফেলে আর একারণেও এদের সংখ্যা রহস্যজনকভাবে কমে গেছে।ধামরাই উপজেলার সুয়াপুর ইউনিয়নের ছোট্ট একটি গ্রামের নাম “রোহা” সেই গ্রামের একটি  তালগাছে বাসা বেঁধেছে এক ঝাঁক বাবুই পাখি। স্থানীয় ফটোগ্রাফার পাভেল বাবুই পাখির বাসার ছবি তুলতে এসে বলেন, ‘বাবুই পাখির বাসা শৈল্পিক নিদর্শন, মানুষের মনে চিন্তার খোরাক ও স্বাবলম্বী হওয়ার উৎসাহ। “রোহা “গ্রামের মোল্লাবাড়ি এলাকার তালগাছে বাবুইপাখি বাসা বাঁধায় এ এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেলেও কালের বিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে আজ বাবুই পাখি ও বাবুই পাখির বাসাই আমরা হারাতে বসেছি।’

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × three =